ইউক্রেনে হামলার পর থেকে রাশিয়ার মুদ্রা রুবলের মান রেকর্ড পরিমাণে কমেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রের জারি করা বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার কারণে রুশ রুবলের এই হাল হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো যুদ্ধ থামাতে রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে চাপে রাখতে এসব নিষেধাজ্ঞা দিলেও সার্বিকভাবে এর প্রভাব পড়ছে বিশ্বজুড়েই। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। রাশিয়ার ব্যাংকগুলোতে সুইফট নিষেধাজ্ঞার ফলে ইতিমধ্যেই ক্ষতির মুখে পড়েছে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য। থেমে আছে তৈরি পোশাক রপ্তানি। এ অবস্থায় রুশ রুবলের মান কমার ফলে কিছুটা চিন্তিত ব্যবসায়ীরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলারের বিপরীতে রুবলের মান কমে গেলে দেশের ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
এতে রাশিয়ার ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাবে। ফলে দেশটিতে পোশাকের বাজার হারানোর শঙ্কা রয়েছে।
ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই নিচের দিকেই ওঠানামা করছে রাশিয়ার মুদ্রা রুবলের। শুরুতেই এক লাফে ডলারের বিপরীতে এর মান কমে যায় অন্তত ৩০ শতাংশ। তখন ১ ডলারের বিপরীতে রুবলের পরিমাণ ছিল ১১৪ রুবল। তবে দেশটির ব্যাংকগুলো থেকে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট ব্যবস্থা সুইফট বন্ধের ফলে রুবলের মান আরও কমেছে। শনিবার এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত গুগল ফাইন্যান্স অনুযায়ী, ১ মার্কিন ডলারের সমান ছিল ১২৪ রুবল। আর বাংলাদেশি ১ টাকার সমান ছিল ১.৪৩ রুবল। অর্থাৎ এখন বাংলাদেশের ১ টাকা কিনতে রাশিয়ার খরচ করতে হবে ১ দশমিক ৪৩ রুবল। আর এক মার্কিন ডলার কিনতে হবে ১২৪ রুবল দিয়ে। যদিও এতে টাকার দাম বেড়েছে বিষয়টি এমন নয়। মূলত রুবলের দাম কমে যাওয়ায় বেড়েছে টাকার মান। আর রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসায়ীক লেনদেন হয়ে থাকে ডলারের মাধ্যমে। সুতরাং ডলারের বিপরীতে রুবলের মান কমার ফলেই কিছু সমস্যায় পড়তে পারেন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা।
ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞার মূল লক্ষ্যবস্তু ছিল রাশিয়ান আর্থিক ব্যবস্থা দুর্বল করে দেয়া। যুদ্ধ পরিচালনায় রাশিয়াকে আর্থিকভাবে পঙ্গু করে দিতে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রম সংকুচিত করার টার্গেট হাতে নেয় পশ্চিমা দেশগুলো। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর ছিল আর্থিক লেনদেনে রাশিয়ান ব্যাংকগুলোকে সুইফট ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেয়া। এর ফলে ব্যাংকগুলোর আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেন কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আর এই অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাতেই মূল্য হারাতে শুরু করেছে রুবল। যদিও এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা রুবলের মান কমা নিয়ে খুব বেশি শঙ্কিত নয়। দেশটির সঙ্গে রপ্তানি বাণিজ্য কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে সেটি নিয়েই চিন্তিত তারা। পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র তথ্যমতে, বছরে রাশিয়ায় সরাসরি প্রায় সাড়ে ৬০০ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়। এ ছাড়া তৃতীয় পক্ষ হিসেবে ইউরোপের দেশগুলোর মাধ্যমে রপ্তানি হয় আরও সাড়ে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের পোশাক। সব মিলিয়ে এক বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়ে থাকে রাশিয়ায়। তাছাড়া রাশিয়ার আশপাশের দেশগুলোতেও বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি হয়ে থাকে। তবে সুইফট বন্ধ হওয়ায় রপ্তানি বন্ধ রয়েছে।
বাংলাদেশ গার্মেন্ট বায়িং হাউজ এসোসিয়েশনের (বিজিবিএ) সভাপতি কাজী ইফতেখার হোসেন মানবজমিনকে বলেন, যখন রুবলের মান কমবে তখন ফরেন এক্সচেঞ্জ রিটার্নে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা টাকা কম পাবে। আর আমরা যেহেতু ব্যবসা করি ডলার দিয়ে। কিন্তু রুবলের বিপরীতে ডলারের দাম যখন বেড়ে যাবে তখন রাশিয়ার ক্রেতারা ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাবে। এতে তারা যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তেমনি বাংলাদেশও পোশাকের বাজার হারাবে। তিনি বলেন, এখন তো ট্রানজেকশনই বন্ধ হয়ে গেছে। যতক্ষণ পর্যন্ত না ব্যবসায়ীক লেনদেন চালু না হচ্ছে, ততক্ষণ রুবলের মান কমা-বাড়া নিয়ে খুব একটা আলোচনা করে লাভ নেই। যদিও এটাও একটি চিন্তার বিষয়। তবে আমাদের দেখতে হবে পরিস্থিতি কোনদিকে যাচ্ছে। যদি লম্বা সময় এই পরিস্থিতি থাকে তবে রপ্তানি বাণিজ্যে প্রভাব পড়তে থাকবে। আর যদি আগামী ৭ দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায় তাহলে হয়তো শঙ্কাটা ধীরে ধীরে কেটে যাবে।
একটি বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তা মানবজমিনকে জানান, একটি দেশের মুদ্রাস্ফীতি ঘটলে যে সমস্যা হয়, ঠিক যখন মুদ্রার মান কমে যায় তখনও সমস্যা দেখা দেয়। তাদের সঙ্গে আমাদের সরাসরি রুবল লেনদেন হয় না। লেনদেন হয় ডলার অথবা ইউরো। এখন ডলারের বিপরীতে রুবলের মান যদি কমে যায় তখন রাশিয়ার ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আবার ধরুন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের কাছে ৪০০ ডলারের একটি পণ্যের ক্রয় আদেশ আছে। এরইমধ্যে যদি রুবলের চেয়ে ডলারের দাম অনেক বেড়ে যায়, তখন তো বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের লস হচ্ছে। আমদানিতে সমস্যা না হলেও রপ্তানিতে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম মানবজমিনকে বলেন, এতে খুব একটা সমস্যা হবে না। কিছুটা প্রভাব হয়তো পড়তে পারে। এখন তো রাশিয়ায় পণ্য দেয়াও বন্ধ আছে। সুতরাং পণ্য যদি না যায় তাহলে সমস্যা কোথায় হবে? তারপরও যুদ্ধের তো একটা প্রভাব আছেই। আমরা দেখছি যে, পরিস্থিতি কোনদিকে যায়। সুত্র:মানবজমিন
Leave a Reply