জওশন আরা (৭০) ও নুরুল ইসলাম (৫০) কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার বাসিন্দা। গতকাল বৃহস্পতিবার জওশন আরা ঢাকার একটি বেসকারি হাসপাতালে ও নুরুল কক্সবাজারের রামু আইসোলেশন সেন্টারে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।
জওশন আরা চকরিয়া উপজেলার পশ্চিম বড় ভেওলা ইউনিয়নের দরবেশকাটার এনামুল হক চৌধুরীর স্ত্রী। আর নুরুল ইসলাম চকরিয়ার খুটাখালী ইউনিয়নের পূর্ব নয়াপাড়ার বাসিন্দা। তিনি চট্টগ্রামের ওয়েল গ্রুপে চাকরি করতেন। তাদের দুজনেরই সন্তানসহ আত্মীয় পরিজন রয়েছেন। কিন্তু শেষ বিদায়ে তাদের দাফন-কাফনে অংশ নেয়নি কেউ।
অবশেষে এই দুজনের মৃত্যুর পর তাদের গোসল, জানাজা ও দাফনে পাশে দাঁড়ায় চকরিয়ার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন স্বাধীন মঞ্চ ও ইসলামি ফাউন্ডেশনের পাঁচ সদস্য। চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ শামসুল তাবরীজের কাছ থেকে খবর পেয়ে লাশ দাফনের জন্য ছুঁটে যান এই যুবকেরা।জওশন আরার দেবর চকরিয়া আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট শহিদুল্লাহ জানান, জওশন আরা সন্তানদের সাথে ঢাকায় থাকতেন। গত কয়েকদিন আগে তার জ্বর হয়। পরে ১৪ জুন তিনি করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা দেন। এতে তার করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। তবে তিনি চিকিৎসকের পরামর্শে বাসায় চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। এর মধ্যে শ্বাসকষ্ট শুরু হলে বুধবার রাতে তাকে ঢাকার একটি প্রাইভেট হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। এরপর গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে তিনি ওই হাসপাতালে মারা যান। পরে রাতে তাকে চকরিয়ার নিজ গ্রামে আনা
অ্যাডভোকেট শহিদুল্লাহ জানান, মৃতদেহ নিজ গ্রামে আনা হলেও দাফনের জন্য কাউকে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে তার আত্মীয়রা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিষয়টি অবহিত করেন। পরে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন স্বাধীন মঞ্চ ও ইসলামি ফাউন্ডেশনের কয়েকজন যুবক এসে লাশের গোসল, জানাজা ও দাফন কাজ করেন।
শহিদুল্লাহ বলেন, ‘জওশন আরার ছেলেমেয়ে, পুত্রবধূ, মেয়ের জামাইসহ অনেক আত্মীয়-স্বজন রয়েছে। ছেলে-পুত্রবধূ বাসায় কোয়ারেন্টিনে থাকায় তারা কেউ আসেনি। তার মেয়ে ও মেয়ের জামাইরা জানাজায় অংশ নিলেও আর কোনো আত্মীয়-স্বজন আসেনি।’
অপরদিকে, খটুখালীর নুরুল ইসলাম করোনায় মারা যাওয়ার খবর পেয়ে এগিয়ে আসেননি তার কোনো আত্মীয়-স্বজন। লাশ দাফনের জন্য পাওয়া যাচ্ছিল না কোনো মানুষ। পরে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন স্বাধীন মঞ্চ ও ইসলামি ফাউন্ডেশনের কয়েকজন যুবক গিয়ে ওই লাশও দাফন করেন।
নুরুল ইসলামের স্ত্রী রোকসানা আক্তার জানান, চলতি মাসের ১১ তারিখ তার স্বামীর জ্বর হয়। পরে তাকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ১৩ জুন তারা তার করোনা পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়। ফলাফলে তার করোনাভাইরাস ধরা পড়ে। এরপর তাকে রামু আইসোলেশন সেন্টারে ভর্তি করা হলে সেখানে তার ডায়রিয়া শুরু হয়। পরে বৃহস্পতিবার রাতে তিনি মারা যান।
নুরুল ইসলামের স্ত্রী বলেন, ‘আমার স্বামী করোনায় মারা যাওয়ার খবরে এলাকায় কেউ দাফন করার জন্য আসেনি। পরে চকরিয়া থেকে স্বাধীন মঞ্চ ও ইসলামি ফাউন্ডেশনের কয়েকজন যুবক এসে আমার স্বামীর গোসল, জানাজা থেকে শুরু করে দাফন করিয়েছে।’
দাফন কাজে অংশ নেওয়া স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন স্বাধীন মঞ্চের স্বেচ্ছাসেবক (উপ-সমন্বয়ক) সৌরভ মাহাবী বলেন, ‘ইউএনও সৈয়দ শামসুল স্যারের কাছ থেকে জানতে পারি দুইজন করোনায় মৃতদেহ দাফন করতে হবে। সাথে সাথে আমরা লাশ দাফনের জন্য বের হয়ে পড়ি। বৃহস্পতিবার রাতে বয়স্ক মহিলার ও শুক্রবার সকালের দিকে এক ব্যক্তির লাশের গোসল, জানাজা শেষে দাফন কাজের সমাপ্ত করেছি। এতে আমাদের সাথে ছিলেন চকরিয়া ইসলামি ফাউন্ডেশনের সুপারভাইজার মাওলানা আমির হোসেন ও হাফেজ মাহবুবুল আলম।’
সৌরভ মাহাবী আরও বলেন, ‘স্বাধীর মঞ্চ বিভিন্ন সামাজিক কাজে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। করোনা মহামারির এই সময়ে লাশ দাফন আমাদের জন্য একটি নতুন অভিজ্ঞতা। দেখা গেছে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার পর তার আত্মীয়-পরিজন কেউ পাশে থাকছে না। এসব কথা চিন্তা করে ইসলামি ফাউন্ডেশন ও স্বাধীন মঞ্চ যৌথভাবে করোনায় মৃতদের লাশ দাফনে কাজ করার সিদান্ত নেয়।’
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সৈয়দ শামসুল তাবরীজ বলেন, ‘করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ওই দুইজনের লাশ দাফনের জন্য এলাকার কাউকে পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে বিষয়টি ইসলামি ফাউন্ডেশনের সুপারভাইজার ও স্বাধীন মঞ্চের সদস্যদের জানানো হয়। তারা লাশ দাফনের কাজে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন। পরে বৃহস্পতিবার রাতে বৃদ্ধ ওই নারীর ও শুক্রবার সকালে এক ব্যক্তির লাশ দাফন করেন তারা।’ এ কাজের জন্য স্বেচ্ছাসেবীদের ধন্যবাদ জানান ইউএনও।
Leave a Reply