1. manjurmesbah83@gmail.com : admin2020 :
শনিবার, ০১ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৩৭ অপরাহ্ন

লাদাখে কে জিতল?

Reporter Name
  • Update Time : শনিবার, ২০ জুন, ২০২০
  • ৫৯৯ Time View

জম্মু-কাশ্মীর-লাদাখ নিয়ে অতীতে উত্তেজনা হতো ভারত-পাকিস্তানে। নাটকীয়ভাবে সেই ছক পাল্টে গেল। ক্ষয়ক্ষতির বিবেচনায় ১৫ জুনের ঘটনা রীতিমতো ভয়াবহ। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে ভারত ও চীন উভয়ে তাতে বেশি রং চড়াতে চাইছে না। ভারত সরকারের দিক থেকে শান্ত ভঙ্গিটি পুরো বিশ্বের নজর কেড়েছে। পাকিস্তানের হাতে ১৯-২০ জন সেনা হারালে, ৭৬ জন সেনা আহত এবং ১০ জন নিখোঁজ হলে নিশ্চিতভাবে নয়াদিল্লির প্রতিক্রিয়া হতো ভিন্ন কিছু। কিন্তু প্রতিপক্ষ চীন বলেই এখনো কোনো ‘সার্জিক্যাল পাল্টা হামলা’র কথা শোনা যাচ্ছে না। ভারতীয় নীতিনির্ধারকেরা তাৎক্ষণিক কোনো সামরিক জবাব না দিয়ে পরিস্থিতি আলোচনার পরিসরে ধরে রাখতে চাইছেন, দক্ষিণ এশিয়ার জন্য বিষয়টা স্বস্তির।

চীনের মনস্তত্ত্ব বুঝতে ভুল করেছে ভারত
চীন ও ভারতের মধ্যে প্রায় আড়াই হাজার মাইল সীমান্ত রয়েছে। অতীতে এই সীমান্তে বিবাদ হতো অরুণাচল প্রদেশ কিংবা সিকিমের আশপাশে। সবশেষ ১৯৬৭-এ এই ফ্রন্টের নাথুলা পাসে একদফা মৃদু সংঘর্ষ হয়, যাতে ৮৮ জন ভারতীয় সেনা মারা যান। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরও কয়েকবার এই সীমান্তে উত্তেজনা দেখা দিলেও তা আগের মতো খুনোখুনিতে গড়ায়নি।

ভুটানের পাশে দোকলামেও দুই দেশ ২০১৭ সালে একদফা রক্তপাতহীন বিবাদে লিপ্ত ছিল প্রায় আড়াই মাস। লাদাখ ও গলওয়ান সে বিবেচনায় ১৯৬২ সালের পুরোনো যুদ্ধ ফ্রন্টের বহু বছর পরের রক্তাক্ত পুনরুজ্জীবন। ১৫ জুনের সংঘর্ষের আগে প্রায় কয়েক সপ্তাহ যাবৎ এখানে দুই পক্ষে উত্তেজনা চলেছে অন্তত তিনটি স্থানে। এ রকম উত্তেজনা অতীতে বহুবার আলোচনার টেবিলে ঠান্ডা করতে পেরেছে চীন-ভারত। কিন্তু এবার কেন তা এত গুরুতর রূপ নিল, সেটা এখনো ভূরাজনৈতিক ভাষ্যকারদের কাছে ধাঁধা হয়ে আছে। ভারতের আনুষ্ঠানিক ভাষ্যেও এটাকে ‘নজিরবিহীন’ বলা হচ্ছে। দেশটির কোনো কোনো দৈনিক একে চীনের তরফ থেকে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ও বলছে। সঠিক শব্দটি হয়তো হবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুতর ‘বিপর্যয়’!

কোভিড-১৯ ছড়ানোর দায়ে বিশ্বজুড়ে চীন বিশেষ চাপে রয়েছে এ মুহূর্তে। আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলছে তার উত্তুঙ্গ বিরোধ। এই সুযোগে ভারত চীন সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে নিজের অবস্থান সবল করার নীরব কৌশল নিয়েছিল। লাদাখকে জম্মু-কাশ্মীর থেকে আলাদা করে ‘কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল’ করা সেই কৌশলেরই অংশ ছিল। পুরো বিষয়টি যে চীনের মোটেই মনঃপূত নয়, সেটাই জানানো হলো বিধ্বংসী উপায়ে।

১৯৬২-র মতোই গণচীনের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভাষা বুঝতে ভারত যে আবারও ভুল করল, সেটা স্পষ্ট। ১৯৬২ সালে নেহরু যেভাবে চৌ এন লাইকে বুঝতে পারেননি, ৫৮ বছর পর মোদিও সি চিন পিংকে বুঝতে একইভাবে ভুল করলেন। অথচ গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকার সময় থেকে মোদি চীনে আসা-যাওয়া করছেন। তখন থেকে আঙ্কেল সি তাঁর বন্ধু হিসেবে প্রচারিত!

সংঘর্ষে নিজের ক্ষয়ক্ষতি সম্পর্কে চীনের নীরবতাও তাৎপর্যবহ। তারা যেকোনো মূল্যে গলওয়ান উপত্যকায় দখল বজায় রাখতে ইচ্ছুক বলেই মনে হচ্ছে। এর অর্থ হচ্ছে, এত দিনকার ‘লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোল’ তারা আর মানতে চাইছে না। ভারত জানাচ্ছে, চীনেরও ৪৭ জন আহত বা নিহত হয়েছে ঘটনায়। এভাবে দুই তরফে যখন শতাধিক সেনা আহত-নিহত হওয়ার বিবরণ মিলছে, তখন এ-ও বলা হচ্ছে, ঘটনাস্থলে গুলির কোনো ঘটনা ঘটেনি। পাথর ও বিভিন্ন ধারালো অস্ত্রের আঘাতে হাতাহাতির মাধ্যমে এত খুন-জখম হওয়ার বিষয় অনেকখানিই রহস্যমোড়ানো।

গলওয়ান সংঘর্ষস্থলের পাশে চীনের চেয়ে ভারতের সামরিক উপস্থিতিই ছিল এত দিন বেশি। ভারতের দৌলত বেগ ওলদি বিমানক্ষেত্রের কাছেই সবশেষ ঘটনাস্থল। এখানে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির কাঠামোগত উপস্থিতি ভারতের চেয়ে তুলনামূলকভাবে কম। ফলে সংঘর্ষের ঘটনা চীনের দিক থেকে যতটা ‘পরিকল্পিত’ বলে ভারতীয় প্রচারমাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। চীন যা চাইছে, গলওয়ান ভ্যালিতে ভারত সব ধরনের অবকাঠামোগত কাজ বন্ধ রাখুক, এমনকি এলাকাটি তাদের হলেও। আপাতত চীনের এই ইচ্ছা ভারতকে হয়তো মেনে চলতে হবে।

লাদাখ মানেই দখল-বেদখলের ইতিহাস
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৪ হাজার ফুট উঁচু গলওয়ান এলাকাটি লাদাখের একেবারে মাঝবরাবর। লাদাখ ভারতের কাছে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হলেও এর বড় এক অংশই বহু আগে থেকে চীনের দখলে, ‘অকছি-চিন’ নামে যা পরিচিত। প্রায় ১৪ হাজার বর্গমাইল হবে এলাকাটি। সবশেষ যুদ্ধটি বেধেছে ওই অকছি-চিন এবং ভারতনিয়ন্ত্রিত লাদাখের সীমান্ত বরাবর। এই সীমান্তটিকেই দক্ষিণ এশিয়ার কূটনীতিবিদেরা ‘এলএসি’ বলেন। এলএসি মানে ‘লাইন অব একচুয়াল কন্ট্রোল’। জম্মু-কাশ্মীরের যে ‘নিয়ন্ত্রণরেখা’র দুই দিকে ভারত-পাকিস্তান নিয়মিত গোলাগুলি করে, সেটাকে বলা হয় এলওসি বা ‘লাইন অব কন্ট্রোল’। এলওসির দুই পাশেই রয়েছে পুরোনো জম্মু ও কাশ্মীর। তেমনি এলএসির দুই পাশে আছে পুরোনো অবিভক্ত লাদাখ। এলওসি এবং এলএসি উভয়ই কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সীমান্ত নয়,Ñকৃত্রিম ও কল্পিত সীমান্তরেখা মাত্র। ফলে বিবাদিত জমিটি কার,Ñএ রকম প্রশ্ন হাস্যকর। কারণ, বিশাল লাদাখের মাঝামাঝি একটা উপত্যকা নিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। উপত্যকাটা মূল লাদাখেরই অংশ। যে লাদাখের একাংশ জম্মু-কাশ্মীরের রাজা দখল করে নিয়েছিলেন ১৮৩৪-এ। সেই সূত্রেই ওই অংশ পরে ব্রিটিশদের হাতে এসেছে এবং ১৯৪৭-এর পর ভারতের নিয়ন্ত্রণে। অপর অংশ চীন যে তাদের শিনজিং প্রদেশের অংশ বলছে,Ñউইঘুর মুসলমানদের এলাকা সেই ‘ইস্ট তুর্কমিনস্তান’ও চীন দখল করে ১৮৯০ নাগাদ। লাদাখ নিয়ে পাল্টাপাল্টি দখলের সেই ঐতিহাসিক খেলারই ধারাবাহিকতা আজকের সংঘর্ষ। শক্তি ও ক্ষমতাই এখানে শেষ কথা। ভূখণ্ডগত ‘মালিকানা’র ধারণা এখানে বন্দুকের নল থেকেই বেরিয়ে এসেছে বারবার।

ভারতের চীন নীতিতে দোদুল্যমানতা
চীনের হাতে ভারতের বিপুল সেনা মারা যাওয়ার বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া বিস্ময়করভাবে সীমিত। তবে ঘটনায় হতবাক হয়েছে সবাই। গত প্রায় চার দশক এই দুই দেশের সীমান্তে এ রকম রক্তপাতের দৃষ্টান্ত নেই। আমেরিকার বর্তমান সরকার ভারতকে প্রাথমিকভাবে কঠোর অবস্থানের পক্ষে উৎসাহ জোগালেও চীনের রুদ্ররূপ দেখে আপাতত শোক প্রকাশের বেশি আর কিছু বলছে না। সম্ভাব্য কোনো যুদ্ধে চীনের বিপরীতে ভারতকে ওয়াশিংটন আদৌ ব্যাপকভিত্তিক সাহায্য দেবে কি না, তার যে কোনো নিশ্চয়তা নেই, সেটা ভারতের অজানা নয়। চীন মনে করে, ভারত সরকারের একাংশকে চীন-বিরোধিতায় নামাতে চাইছে ওয়াশিংটন। গলওয়ানে পরিস্থিতির যতটুকু অবনতি ঘটেছে, সেটা ওই উসকানির কারণেই। ১৫ জুনের ঘটনার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক জোরদারের জন্য ভারতে মতামত জোরালো হচ্ছে। অনেকেই এ ক্ষেত্রে জাপান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ককে মডেল হিসেবে তুলে ধরছেন। সাবেক বিদেশসচিব নিরুপমা রাও ইতিমধ্যে দ্য হিন্দুতে প্রবন্ধ লিখে এ বিষয়ে জোরালো অভিমত তুলে ধরেছেন। এ রকম দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে বিপদের দিক আছে। এটা আলোচনা ও লেনদেনের মাধ্যমে সীমান্তবিরোধ মীমাংসার সম্ভাবনাকে খাটো করে। চীন-ভারত সীমান্ত বিরোধ দীর্ঘায়িত হয়েছে মূলত এ রকম দোদুল্যমানতা থেকেই। কেবল ২০০৩ থেকে গত ১৭ বছরে ২২ বার ভারত ও চীনের আলোচকেরা সীমান্ত নিয়ে কথা বলেছেন। কিন্তু কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারছেন না।

একদা ১৯৬০-এ চীন অকছি-চিনের বিনিময়ে অরুণাচলের ওপর দাবি প্রত্যাহারের প্রস্তাব দিয়েছিল ভারতকে। নয়াদিল্লি সেই প্রস্তাব গ্রহণ করলে আজ গলওয়ানে নতুন করে হয়তো রক্ত ঝরত না। চীনের ওই প্রস্তাবে এ-ও ছিল, অকছি-চিনে তাদের সার্বভৌমত্ব মেনে নিলে জম্মু-কাশ্মীরে ভারতের নিয়ন্ত্রণও চীন মেনে নেবে। ভারতে শাসক পরিমণ্ডলে সিদ্ধান্তহীনতার কারণে ঐতিহাসিক সেই বোঝাপড়া ঘটেনি। আর ইতিমধ্যে গণচীনের শক্তি-সামর্থ্যও এত বেড়েছে, পুরোনো আপসমূলক মনোভাব তাকে এখন না দেখালেও চলছে। বরং কল্পিত সীমান্তরেখাকে ভারতীয় সীমান্তের অনেক ভেতরে ঠেলে দিতে চাইছে তারা। অরুণাচলও যেকোনো সময় আবার বেইজিং শক্তভাবে দাবি করে বসতে পারে। সেটা এ কারণেও যে অরুণাচলের একটা জেলাতেই ষষ্ঠ দালাই লামার জন্ম। এই অঞ্চলের মালিকানা না থাকার অর্থ দাঁড়ায়, দালাই লামা চীনের কেউ নন। চীনের জন্য এটা অত্যন্ত স্পর্শকাতর প্রসঙ্গ।

জম্মু-কাশ্মীর-লাদাখের দুর্ভাগ্য
লাদাখে ভারত-চীন সংঘর্ষ কিংবা জম্মু-কাশ্মীরের এলওসির দুই পাশে ভারত-পাকিস্তানের সংঘর্ষ কেবল এই তিন দেশের স্বার্থের দিক থেকেই ক্ষতিকর নয়, কাশ্মীরি ও লাদাখিদের জন্যও দুর্ভাগ্যজনক। বিশ্বের অন্যতম সুন্দর ও এককালের শান্ত এলাকাটির চরম দুর্ভাগ্য, একের পর এক সেটি খণ্ডবিখণ্ড হচ্ছে আর তার ওপর অধিকার নিয়ে লড়ছে তিন পরাক্রমশীল দেশ। ১৯৪৭-এও যে জম্মু-কাশ্মীর-লাদাখ একত্র ছিল, সেটা এখন পাঁচ খণ্ড হয়ে আছে।

জম্মু ও কাশ্মীরের দুই খণ্ড ভারত-পাকিস্তান দুই দেশ নিয়ন্ত্রণ করছে। লাদাখের একাংশ (প্রায় পাঁচ হাজার বর্গকিলোমিটারের সাকসগ্রাম ভ্যালি) পাকিস্তান চীনকে ব্যবহার করতে দিয়ে রেখেছে ১৯৬২ সালে, যা চীন এখন নিজের ভূখণ্ডই মনে করছে। এর বাইরে অকছি-চিন অংশ তো রয়েছেই তাদের হাতে। লেহ ও কারগিল জেলা নিয়ে গঠিত বাকি অংশ রয়েছে ভারতের নিয়ন্ত্রণে। এ ছাড়া রয়েছে ‘সিয়াচেন হিমবাহ’ এলাকা। সেটা নিয়েও ভারত-পাকিস্তান বিবাদে লিপ্ত। লাদাখ-সন্নিহিত গিলগিট-বালতিস্থান আবার ১৯৪৭ থেকে পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে। চীন-পাকিস্তানের যৌথ অর্থনৈতিক করিডর ওই অঞ্চল দিয়েও যাচ্ছে। মোদ্দা কথা, লাদাখ, জম্মু, কাশ্মীর, বালতিস্থান—কোনো এলাকাই স্থানীয়দের শাসনে নেই আজ আর। যে ভ্যালি নিয়ে সবশেষ সংঘর্ষ হলো, সেই গলওয়ানের নামকরণও হয়েছিল গোলাম রসুল গ্যালওয়ান নামের স্থানীয় একজন ভূগোলবিদের নামে, ভারত কিংবা চীনের কারও নামে নয়। গোলাম রসুল ছিলেন কাশ্মীরের গ্যালওয়ান উপজাতির লোক। মূলত ব্রিটিশ ভূগোলবিদদের সঙ্গে তিনি ওই অঞ্চলে কাজ করতেন।

মোদির ‘লৌহমানব’ ইমেজ প্রশ্নবিদ্ধ
ভারত বহুকাল থেকে চীনের নিয়ন্ত্রণে থাকা লাদাখের অকছি-চিন অংশ ফেরতের দাবি জানিয়ে আসছিল। এখন গলওয়ান নিয়ে যুদ্ধ বাধার একটা পরোক্ষ ফল হবে, অকছি এলাকা নিয়ে চীনের সঙ্গে দর-কষাকষির আর কোনো সুযোগই থাকছে না। যেহেতু সংঘর্ষ হয়েছে ‘নিয়ন্ত্রণরেখা’র ভেতরে ভারতীয় অংশে এবং চীন এখনো সেখান থেকে সরেনি, তাই গলওয়ানের ঘটনা ভারতের দিক থেকে এক কদম স্থায়ী পিছু হটা। চীন যদি লাদাখে বাড়তি ভূমি দখলে নিয়ে এবারের মতো রেখে দিতে পারে, তাহলে অরুণাচল প্রদেশের ওপর পুরোনো দাবি নিয়ে সে আগামী দিনে আরও কঠোর হতে পারে। ভারতের জন্য সেটা লাদাখের চেয়েও বাড়তি দুর্ভাবনার কারণ।

২০ জন সেনা হারানো ভারতের রাজনীতিতে বিজেপির জন্য ইতিমধ্যে প্রায় ভূমিকম্পতুল্য ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে প্রায় স্থায়ী উত্তেজনা জারি রেখে দলটি দেশের রাজনীতিতে যে ফায়দা ভোগ করেছে এত দিন, লাদাখ ফ্রন্টের ঘটনা তার প্রায় পুরোটা হুমকিতে ফেলে দিয়েছে। মোদিকে তাঁর সমর্থকেরা জাতীয় স্বার্থে একজন ‘লৌহমানব’ হিসেবে তুলে ধরতে পছন্দ করে। কিন্তু গলওয়ানে ভারতীয় সেনাদের মৃত্যু এবং অন্তত ১০ জনের অপহৃত হওয়ার ঘটনা সেই ইমেজকে প্রবলভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। চীন কর্তৃক সৈন্য আটকের ঘটনা ভারতীয় সেনাবাহিনী বারবার অস্বীকার করলেও এখন তা সত্য প্রমাণিত হওয়ায় ভারতীয় নাগরিকদের জন্য তা যথেষ্ট মানসিক পীড়ার কারণ হয়েছে। ঘটনার চার দিন পরও ভারত কোনো প্রতিশোধমূলক সামরিক পদক্ষেপ নেয়নি। সেটা যে সুবিধাজনক কোনো বিকল্প নয়Ñ তা সবার কাছেই স্পষ্ট। পুরো দৃশ্যটিতে ১৯৬২-র অক্টোবর যুদ্ধের চেয়েও খারাপ একটা পুনরাবৃত্তি যে ঘটে গেছে, সেটা ভারতে সবাই টের পেয়ে গেছেন। ১৯৬২ সালে যা ঘটতে এক মাস সময় লেগেছে, ২০২০-এ সেটা এক বিকেলেই ঘটে গেছে।

বেদনা ভুলতে চীনের পণ্য বয়কট?
ভারতীয় নেতৃত্ব গত কয়েক বছর ধরেই বারবার চীনকে শোনাচ্ছিল, ১৯৬২-র ভারত এখন অনেক পাল্টে গেছে। কিন্তু চীন যে সেই তুলনায় আরও বেশি পাল্টে গেছে, সেটাই জানিয়ে দিল তারা লাদাখের মাটিতে দাঁড়িয়ে ১৫ জুন।

সামগ্রিক লক্ষণ বলছে, নয়াদিল্লি সামরিক বদলার বিপরীতে অসামরিক পদক্ষেপের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। যদিও চীন-বিরোধিতায় ক্ষুব্ধ সাধারণ ভারতীয়দের এরূপ কৌশল কতটা তৃপ্ত করতে পারবে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। ইতিমধ্যে চীন থেকে আসা পণ্যসামগ্রীতে বাড়তি শুল্ক আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে নয়াদিল্লিতে নীতিনির্ধারকেরা ইঙ্গিত দিচ্ছেন।

ভারতের আমদানির ১৪ ভাগ আসে চীন থেকে। বছরে এই পরিমাণ প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ বিলিয়ন ডলার সমান। ভারতের যেসব শিল্প খাত কাঁচামালের জন্য বিপুলভাবে চীননির্ভর, তার মধ্যে আছে ওষুধ খাতও। এসব ক্ষেত্রে বাড়তি শুল্কের উদ্যোগ চীনের জন্য যেমন ক্ষতিকর হবে, ভারতের জন্যও সেটা সুখকর হবে না। আবার চীনে ভারতের রপ্তানির পরিমাণও বড় কম নয়, প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার। সেটাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা আছে বয়কট আন্দোলন দ্বিপক্ষীয় রূপ নিলে। তারপরও এ মুহূর্তে চীনের পণ্যে বাধা দিয়ে নিজেদের ‘আত্মনির্ভর’ করার আবেগে ভাসছে ভারতের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বিজেপির অনেক স্থানীয় নেতা আগামী বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে চীন থেকে অন্তত ১৩ বিলিয়ন ডলার সমমূল্যের পণ্য আমদানি কমানোর লক্ষ্যমাত্রাও ঠিক করে ফেলেছেন।

কিন্তু চীন থেকে পণ্য আমদানি বন্ধ হলেই কি ভারতজুড়ে শিল্পবিপ্লবের ঢেউ বয়ে যাবে? এমন ভাবা বাণিজ্যিকভাবে হাস্যকর। বরং তখন ভারতীয় ক্রেতাকে অন্য দেশের একই পণ্য কিনতে হতে পারে বেশি দাম দিয়ে। টিভি, স্মার্টফোন, ফ্রিজ, এসি ইত্যাদি চীনা পণ্য অনেক দেশেই যন্ত্রাংশ আকারে ঢোকে এবং দেশীয় প্ল্যান্টে মূল পণ্যটি তৈরি হয়। এ রকম ক্ষেত্রে বর্জন আন্দোলনের মুখে স্থানীয় প্ল্যান্ট ও স্থানীয় শ্রমিকেরাই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।

ভারতজুড়ে সম্প্রতি ডিজিটালাইজেশনের যে ঢেউ চলছে, তা সহজ হয়েছে সস্তা চীনা প্রযুক্তির কল্যাণেও। এ ক্ষেত্রে বাধা এলে পুরো প্রক্রিয়াটির গতি শ্লথ হয়ে যেতে পারে। চীনবিরোধী ভারতীয় বয়কট আন্দোলন কিছু কিছু ক্ষেত্রে এ রকম আত্মঘাতী ফল বয়ে আনতে চলেছে বলেও বাণিজ্য গবেষকেরা সতর্ক করছেন। রাজনৈতিক ও সামরিক হতাশাকে বাণিজ্যিক অস্ত্র দিয়ে মোকাবিলা আজকের দুনিয়ায় প্রায় অসম্ভব। তারপরও অনেকগুলো বড় টেন্ডার প্রক্রিয়া থেকে চীনের কোম্পানিগুলোকে বাদ দেওয়া হয়েছে এরই মধ্যে।

এদিকে ভারত যখন চীনা পণ্যে বাড়তি শুল্ক বসানের ইঙ্গিত দিচ্ছে, শেষোক্ত দেশ তখন প্রতিশোধ হিসেবে দ্বিপক্ষীয় নদীগুলোর প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার দিকে যেতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। ইতিমধ্যে লাদাখে গলওয়ান নদীর প্রবাহে চীন বাধা দিচ্ছে বলে ভারত স্যাটেলাইট ইমেজে দেখতে পেয়েছে। একই ঘটনা ব্রহ্মপুত্রের ক্ষেত্রে ঘটলে ভারতের উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ রয়েছে। এই নদীর পানিতে ভারতের রয়েছে বিপুল নির্ভরতা। ভারতজুড়ে এ মুহূর্তে প্রতিদিন যেভাবে চীনের নেতাদের ছবিতে আগুন দেওয়া হচ্ছে, সেটা উভয় দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিকের পথে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি করে রেখেছে। উপরন্তু নয়াদিল্লি যদি যুক্তরাষ্ট্রকে এ বিষয়ে বাড়তি নাক গলাতে দেয়, বেইজিংয়ের তরফ থেকে তা নিশ্চিতভাবেই বাড়তি ক্রোধ তৈরি করবে।

পারস্পরিক সমস্যা যতই থাক, প্রতিবেশী বদলানো যায় না, এই চিরসত্য ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই। পরাক্রমশালী চীন ভারত সীমান্তে একটা বাস্তবতা, এই সত্য ভারতীয়দের স্বাভাবিকভাবে কবুল করার মানসিকতা থাকতে হবে। সামরিক বিবাদ, সীমান্ত বিবাদ ও বাণিজ্যিক বিষয়গুলোকে যদি জাতীয় আবেগে একাকার করে ফেলা হয়, তাহলে চীন-ভারত সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী বহুমাত্রিক বৈরিতার দিকে যেতে পারে। সে রকম শঙ্কা কেবল দুই দেশের জন্য নয়, তাবৎ বিশ্বের জন্যই উদ্বেগের হবে।

উত্তেজনা সম্ভবত থিতিয়ে আসবে
ভারত-চীন মিলে বর্তমানে ২৭৫ কোটি মানুষের বাস। বিশ্ব জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ যেকোনো বৈরিতায় লিপ্ত থাকা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য খুবই খারাপ নজির হবে। বিপুল আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ রয়েছে এই দুই দেশে। আবার উভয় দেশের হাতে রয়েছে অন্তত ৪০০ পারমাণবিক অস্ত্রের বিশাল মজুত।

এ রকম অবস্থায় আলোচনাই একমাত্র সহনীয় পথ। ভারত এখনো আলোচনার ওপরই বেশি জোর দিচ্ছে। পরিস্থিতির পরবর্তী অধ্যায় তাই অনেকখানি নির্ভর করছে চীনের মনোভাবের ওপর। চীনের দিক থেকে সীমিত শক্তি প্রদর্শনের ইচ্ছা পরিতৃপ্ত হয়ে থাকলে এই যুদ্ধংদেহী অবস্থা থিতিয়ে আসবে বলেই মনে হয়। ইতিমধ্যে আটক ভারতীয় সৈন্যদের অক্ষত ফেরত দিয়ে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং যে বার্তা দিলেন, তা ইতিবাচক। লাদাখের আবহাওয়াও এমন বৈরী যে চীন ও ভারত কোনো পক্ষই সেখানে দীর্ঘ সময় উত্তেজনা জিইয়ে রাখার কৌশল নেবে বলে মনে হয় না। তবে যখনই যে মাত্রায় পরিস্থিতি শান্ত হবে, মোদি সরকারকে একতরফা সামরিক ক্ষয়ক্ষতির জন্য দেশের বিরোধী দলগুলোর কাছে মোটাদাগে জবাবদিহি করতে হতে পারে এবার।

২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম মোদি সরকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোণঠাসা অবস্থায় পড়তে যাচ্ছে। জোরেশোরে চীনা পণ্য বর্জনের আওয়াজ তোলা হচ্ছে দুরূহ ওই অবস্থা এড়ানোর কৌশল হিসেবেই। ভারতজুড়ে এ সপ্তাহে বিজেপির অঙ্গসংগঠনগুলো পালা করে চীনের পতাকা পোড়াচ্ছে এবং চীনা পণ্যের বিজ্ঞাপন মুছে চলেছে। তবে পাল্টা শক্তি প্রদর্শনের বিকল্পও নয়াদিল্লি একেবারে বাদ দিয়েছে, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। রাজনৈতিক অস্তিত্ব ঝুঁকিতে পড়লে সেটাও ঘটে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে যুদ্ধ হবে, স্রেফ সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে।সুত্র প্রথমআলো

আলতাফ পারভেজ: গবেষক

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

Recent Comments

    calendar 2026

    June 2026
    M T W T F S S
    1234567
    891011121314
    15161718192021
    22232425262728
    2930  
    © All rights reserved © 2019 OnlineChannel
    Theme Customization By onlinechannel.Com