ইসলাম এবং রাজনীতি এ বিষয়টা নিয়ে লেখার ইচ্ছা ছিল অনেক দিন থেকে। কিন্তু ব্যাপারটা একদিকে যেমন জটিল অপরদিকে স্পর্শকাতর।
বেশ কিছুদিন আগে বাংলাদেশের চেঞ্জ টিভি নামে একটি ইউটিউব চ্যানেলে আধুনিক বিশ্বে কেন ইসলামী রাজনীতি ব্যর্থ হচ্ছে সে বিষয় একটি আলোচনা ছিল। সে আলোচনার পর আমি একটি কমেন্টে এ বিষয়ে লিখব বলেছিলাম।
কিন্তু নাহ, ইসলাম এবং রাজনীতি বিষয়ে আজো লিখবোনা। তবে বলা যায় কিছুটা ওয়ার্ম আপ হিসাবে কয়েকটি প্রশ্ন রেখে আজকের প্রসঙ্গে যাব। প্রশ্নগুলো হল, ইসলাম ও রাজনীতি বলতে আমরা আসলে কি বুঝি বা বুঝাতে চাই। রাজনীতি নাকি পলিটিক্স, সিয়াসত? খিলাফাত? হুকুমাত? নাকি বিপ্লব।
আমরা জানি রাজনীতি বাংলা শব্দ, যার ইংরেজি হল পলিটিক্স, আরবি হল সিয়াসাত। শব্দগুলোর শাব্দিক অর্থ এক হলেও পারিভাষিক বা ব্যাবহারিক বিপুল পার্থক্য রয়েছে। কথাটা আরো খোলাসা করতে গেলে বলা যায়, আমরা যারা ইসলামী রাজনীতিতে বিশ্বাস করি তাঁরা কোন ধরণের রাজনীতির কথা বলছি। ম্যাকিয়াভিলিজম? ট্রাম্প টাইপের রাজনীতি নাকি হাসিনা টাইপের? নাকি সৌদি আরব কিংবা ইরান স্টাইলের রাজনীতি?
সে যাক আজ তাহলে আজকের প্রসঙ্গে আসি। প্রসঙ্গ পশ্চিম বংগের হঠাত উদিত হওয়া নবীন রাজনীতিবিদ আব্বাস সিদ্দিকি ওরফে ভাইজান এবং তাঁর নতুন রাজনৈতিক দল “ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট” বা আই এস এফ।
আবাস সিদ্দিকি, ফুরফুরা পীরের বংশধর এবং তৃতীয় কিংবা চতুর্থ সাহেবজাদা। এই যুবক এখন শুধু পশ্চিম বংগ নয় পুরো ভারতের রাজনীতিবিদের কাছে আলোচিত। আবাস সিদ্দিকি বা ভাইজান ফুরফুরা পীরের বংশধরই শুধু নন, পীর ও। এই পীর এবং তাঁর রাজনৈতিক দল ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট আসন্ন বিধান সভার নির্বাচনকে সামনে রেখে বাম দলগুলোর সাথে জোট করেছে এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। পাঠকদের গভীর দৃষ্টি আকর্ষণ এবং চিন্তার লক্ষ্যে মনে করিয়ে দিচ্ছি। আব্বাস সিদ্দিকি হল ফুরফুরার পীর, বলা পশ্চিম বঙ্গের মুসলমানরাদের মুরুব্বি। তিনি দল করেছেন “সেকুলার ফ্রন্ট” জোট বেধেছেন বাম দলগুলোর সাথে। শুধু তাই নয়, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ যে তাঁর এই রাজনীতির কারণে মুসলমানদের ভোট ভাগ হবে যার ফলে ক্ষমতাসীন তৃনমূল কংগ্রেস হেরে যেতে পারে বি জে পির কাছে। এবং এই কারণেই পশ্চিম বঙ্গে বি জে পি আধিপত্য বিস্তার করতে পারে। যেটা কারো কারো দৃষ্টিতে মুসলমানদের জন্য খাল কেটে কুমির আনা হতে পারে। কিংবা নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারা।
আব্বাস সিদ্দিকির প্রথম সাক্ষাতকার আমি দেখেছিলাম প্রায় বছর খানেক বা বছর দেড়েক আগে। কিছুটা ভাল লাগলে কারো কাছেই যেমন গুরুত্ব পূর্ণ বিষয় ছিলনা আমার কাছে ছিলনা। এবং সত্যি বলতে অনেক কিছু সেদিন বুঝতে ও পারিনি। মজার ব্যপার হল, আজ থেকে ৪-৫ মাস আগে এই আব্বাস যখন ফোকাসে আসে তখন তাঁর সম্পর্কে কয়েকটি সংবাদ এবং সাক্ষাতকার দেখি তাতে কেউ কেউ বলার চেষ্টা করে যে তিনি বি জে পি র হয়ে ভোট ভাগ করতে রাজনীতিতে নেমেছেন এবং বি জে পি কেই জেতাবেন।
সে সব সংবাদ এবং সাক্ষাতকার দেখে আমি ও ধরে নিয়েছিলাম যে আব্বাস সিদ্দিকিও তথাকথিত একজন পীর যিনি বি জে পির স্বার্থ হাসিলের জন্য মাঠে নেমেছেন। তাই কৌতূহলী হয়ে গত কয়েক মাসে আব্বাস সিদ্দিকির কয়েকশত বক্তব্য শুনি, শুনেছি তাঁর বিরোধী পক্ষের, এবং শুনছিলাম পশ্চিম বঙের বেশ কয়েকটি টিভি চ্যনেলের ।
এখানে দুটো বিষয় খুবই দৃষ্টি আকর্ষক
এক পীর আব্বাস সিদ্দিকির রাজনীতিতে নামা, পীর সাহেবের সেকুলার ফ্রন্ট গঠন এবং বাম দলগুলোর সাথে জোট বাঁধা।
দুই সংখ্যালঘু তথা মুসলমানদের ভোট বা ভাগ করে পশ্চিম বংগে বি জে পি আগমনের পথ খুলে দেয়া।
২রা মের নির্বাচনে কি হবে তা স্বভাবতই কেউ বলতে পারবে না, তবে এখানে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট যে, আসলে পীরজাদা আব্বাস সিদ্দিকি তথা পশ্চিম বঙের মুসলমানদের কাছে আর বিকল্প কোন পথ ছিলনা। কারণ সাম্প্রদায়িক দল বিজেপি সন্ত্রাস ষড়যন্ত্র আর নির্যাতন এমন পর্যায়ে গিয়েছে যে মুসলমানরা যদি নিজেরা সোজা হয়ে না দাঁড়ায় তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। হ্যাঁ অনেকে প্রশ্ন করছে এবং আব্বাস বিরোধীরা বলতে চাইছেন যে আব্বাস সিদ্দিকি যদি সংখ্যা লঘুদের ভোট ভাগ করে বিজেপি পশ্চিম বঙে নিয়ে আসেন? এই প্রশ্ন আব্বাসকে অনেকবার অনেকে করেছে তিনি তাতে যে উত্তর দিয়েছে এবং প্রকৃতপক্ষে আমরা যা দেখছি যে বিজেপি পশ্চিম বঙে ঢুকেই গেছে।। আমরা সবাই জানি তৃনমূলের ৫ জন এম পি কে বিজেপি কিনে নিয়েছেন। শুধু এই ৫ জন এম পি ই নয়, তৃনমূলের আরও শতাধিক নেতা কর্মী বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন বা দিচ্ছেন। মমতা ব্যানারজির ডান হাত খ্যাতরাও বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। তৃনমূল থেকে যারা বি জে পিতে যোগ দিয়েছেন তাঁদের অনেকের বা প্রায় সকলের সাক্ষাতকার আমি শুনেছি, বিজেপিতে যোগদানকারী তৃনমূলের দলত্যগী এসব নেতাদের কথা শুনে একটা কথা মনে হয়েছে যে এর সবাই যে লোভে পড়ে বিজেপি তে যাচ্ছেন তা নয়, এদের প্রায় সবাই মমতার বিরুদ্ধে স্বৈরাচারী আচরণের অভিযোগ তুলেছেন। মমতা এবং তাঁর ভাইপোর বিরুদ্ধে চরম চাঁদাবাজি বা পশ্চিম বঙের ভাষায় তোলাবাজির অভিযোগ। সবার একই কথা যে দিদি এখন পিসি হয়ে গেছেন। তাই এটাও স্বীকার করতে হবে যে রাজিনিতিতে যখন স্বৈরাচারী আচরণ আর একনায়কতন্ত্র প্রবেশ করে তখন সে রাজনীতি শেষ হয়ে যায়।
এখানে কেউ কেউ আব্বাস সিদ্দিকির যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এ ব্যাপারে আমি আমার এক অভিজ্ঞ অধ্যাপক বন্ধুর সাথে কথা বলছিলাম তিনি উদাহরণ টেনেছিলেন যে আব্বাস সিদ্দিকির এই হঠাত রাজনৈতিক উদয় ১৯৮২ সালে এমনি ভাবে হঠাত উদিত মোহাম্মাদ উল্লাহ হাফেজ্জি হুজুর এবং খেলাফত আন্দোলনের মত হয়ে যায় কিনা। হাফেজ্জি হুজুর এর রাজনীতিতে হঠায় উদয় হওয়া ব্যর্থ হয়েছিল কিনা বা ব্যর্থ হয়ে থাকলে কেন হয়েছিল সে ব্যাপারে পরে একদিন অন্যা আলোচনায় লিখব। তবে পিরজাদা আব্বাস সিদ্দিকির রাজনৈতিক যোগ্যাটার ব্যাপারে আমার বিন্দু মাত্র সন্দেহ নাই। আমি পিরজাদা আব্বাস সিদ্দিকির প্রায় অর্ধ শতাধিক সাক্ষাতকার দেখেছি। আমি সত্যি ইম্প্রেসসড। আব্বাসিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল তিনি এখন কেন রাজনীতিতে এসেছেন? তাঁর উত্তর ছিল, ভারতীয় মুসলমানদের নাগরিকত্ব আইন প্রনয়েনের আগে তো আমি কোনদিন রাজনীতির কথা বলিনি, এবং রাজনীতিতে আসবো ভাবিনি। তখন আবার প্রশ্ন করা হয়েছিল তাহলে এই নির্বাচনের পরে ২০২২ সাল থেকে রাজনীতি শুরু করুন। তাঁর উত্তর ছিল, ২০২১ সালের পর মুসলমান হিসাবে আমি ভোট দিতে পারব কিংবা নাগরিকত্ব থাকবে এই নিশ্চয়তা দিতে পারবেন?
শুধু তাই নয়, আব্বাসিকে তিনি যখন পীর হিসাবে দায়ী হিসাবে দেয়া অনেক বক্তব্য দিয়েছে সেসব বক্তব্যাএ ভিডিও টেনে জটিল প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি দিল্লীর দাঙ্গা প্রসঙ্গে তিনি নাকি দুঃখের সাথে বলেছিলেন আল্লাহ যেন এমন একটা অসুখ দেন যে অসুখে হাজার হাজার মানুষ মরে যায়, সাক্ষাতকার গ্রহন কারি তখন বলেন একজন মানুষ হিসাবে আপনি তো মৃত্যু কামনা করতে পারেন না। আব্বাসি তখন বলেন, আসলে আমি মনের কষ্টে আল্লার কাছে বিচার দিয়েছি। আমাদের দেশে তো বিচার নাই, মুসলমানদেরকে এভাবে জবাই করা হচ্ছে কোন বিচার হচ্ছে না।
পশ্চিম বঙ্গের মুসলিম নামধারী এম পি নুসরাত জাহান যিনি একজন হিন্দুকে বিয়ে করেছেন এবং পূজায় গিয়ে পূজা দেন, এবং সম্ভত ভারতীয় সিনেমার অভিনেত্রী। এই সম্পর্কে আবাস অনেক আগে কোন এক ধর্মীয় সভা তাঁকে দেহ বিক্রেতাদের সাথে তুলনা করেছিলেন এবং বলেছেন, তোমার মনে চায় তুমি হিন্দু হয়ে যাও খ্রিস্টান হয়ে যাও আমাদের কোন আপত্তি নাই কিন্তু ভোটের প্রয়োজন হোলে আমাদের মসজিদে এসোনা। এ সম্পর্কে তাঁকে প্রশ্ন করা হয় যে গণতান্ত্রিক অধিকারে যে কেউ যে কোন খানে যেতে পারে আপনি বাঁধা দেবেন কেন, তখন আব্বাস বলেছিলেন, মসজিদে মন্দিরে গেলেই ধর্মনিরপেক্ষতা হয়না। মসজিদের পাশে মন্দিরের পাশে যে ভুখা লোকটা খাবার পায় না, তাঁকে খাবার দেয়াই প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা, টুপি পরে, হিজাব পরে মুসজিদে এসে ভোট নিয়ে, অবহেলিত মানুষের খবর না নিয়ে সিনেমায় অভিনয় করার না ধর্মনিরপেক্ষতা নয়।
এসব রাজিনিতিবিদ দের সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি এক বক্তব্যে বলেছিলেন, আমরা ক্ষমতায় গেলে তোদেরকে গাছে বেঁধে পিটাব। সে প্রসঙ্গে সাক্ষাতকার গ্রহণকারী প্রশ্ন করেন যে, আইন তো আপনি নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন না। আমরা ক্ষমতায় আসলে পুলিশ করবে, প্রশ্ন করা হল পুলিশ ও তো আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারেন না, আব্বাসি বললেন কিন্তু এখন তাই তো হচ্ছে? সাংবাদিক বললেন কিন্তু এটাও বে আইনি। এক পর্যায়ে আব্বাস সিদ্দিকি বলেন। দেখুন আমি রাজনীতিতে নতুন, রাজনীতির ‘’র’ ও বুঝিনা। কোনটা বেআইনি আর কোনটা শিখছি। আমার কথায় যদি কেউ আঘাৎ পায় আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
সামগ্রিকভাবে একদিকে আব্বাসের দৃঢ়তা, বুদ্ধিমত্তা অপরদিকে বিনয়, সত্যিই অভিভূত হবার মত। হ্যাঁ, ভোটের রাজনীতি ভিন্ন। ভোটের রাজিনিতে ২রা মে কি হবে কেউ বলতে পারছে না। তবে আব্বাস সিদ্দিকির রাজনীতিতে আসা আমরা মনে করে একটি সময়পোযোগি পদক্ষেপ। শুধু তাই নয়, সেকুলার দল গঠন এবং বাম দলগুলোর সাথে জোট গ্রহণ ও স্থান কাল এবং পাত্রের প্রেক্ষাপটে বিকল্পহীন পদক্ষেপ।
আল্লাহ পাক ভারতীয় মুসলমানদের হেফাজত করুন।
Leave a Reply